মহাস্থানগড় : বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী !

0
237

মহাস্থানগড় প্রায় আড়াই হাজার (২৫০০) বছর এরও বেশি পুরনো একটি নগরী। মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নগরী। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুন্ড্রবর্ধন বা পুন্ড্রনগর নামে পরিচিত ছিল। ১৮০৮ খ্রীস্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন  হ্যামিল্টন সর্বপ্রথম মহাস্থান গড়ের অবস্থান চিহ্নিত করেন। ১৮৭৯ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রাচীন এই ঔতিহাসিক নগরীকে পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী রূপে চিহ্নিত করেন। প্রাচীন কালে এটি বিদ্যা অর্জনের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাই সুদুর চীন থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে বিদ্যা অর্জনের জন্য এখানে আসত।

মহাস্থাগড়ের অবস্থান

মহাস্থানগড় বগুরা জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীরে প্রাচীন এই প্রত্নস্থানটি অবস্থিত। প্রাচীর ঘেরা এ নগরটি গৌড়ের রাজধানী ছিল। বগুড়া জেলার নিদর্শনের মধ্যে মহাস্থানগড় অন্যতম এবং জনপ্রিয় একটি জায়গা।

মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন স্থাপনা ও ঐতিহ্য

চারপাশে প্রাচীর ঘেরা এক দুর্গনগরী মহাস্থানগড়। বিভিন্ন সময় খননের ফলে নগরের ভিতরে ও বাহিরে বিভিন্ন স্থাপনার সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। এই খননে ফলে মহাস্থান গড়ের কয়েকটি প্রবেশদ্বার আবিষ্কার হয়েছে। মহাস্থান গড়ে গেলে দেখা মেলে  হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার (রঃ) এর মাজার। হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার (রঃ) ছিলেন চৌদ্দ শতকের দরবেশ। ইনি ইসলাম প্রচার এর উদ্দেশ্য সুদুর বল্লদেশ থেকে মহাস্থান গড়ে এসেছিলেন।

সেখানে এসে হিন্দু রাজা পশুরামকে ইসলাম এর দাওয়াত দেন। কিন্তু পশুরাম ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করেন।তা স্বত্তেও সেখানকার লোকেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছিল। সেই জন্য পশুরাম হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার (রঃ) এর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সেই যুদ্ধে হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার (রঃ) পশুরামকে  পরাজিত করে সেখানে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠত করেছিলেন। বর্তমানে তিনি এখানে শায়িত অবস্থায় আছেন।

প্রতিদিন অনেক মানুষ এই মাজার দেখতে আসেন। মহাস্থানগড়ের পূর্ব পাশে রয়েছে করতোয়া নদী। এই নদীর তীরে রয়েছে শিলাদেবীর ঘাট। শিলাদেবীর ঘাটের পশ্চিমে জিয়ৎ কুপ নামের একটি কুয়া রয়েছে। বলা হয় এই কুয়ার পানি খেলে পশুরামের আহত সৈনিকেরা সুস্থ হয়ে যেত। যদিও এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। জিয়ৎ কুপের পাশেই একটি প্রাসাদের ভিত্তি খুজে পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। এই প্রাসাদটি পশুরামের প্রাসাদ নামে পরিচিত। পশুরামের প্রাসাদ ঐতিহাসিক মহাস্থান গড়ের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে যেসব প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম।মহাস্থান গড়ের উত্তর পূর্ব কোণে  পশুরামের প্রাসাদ হতে ২০০ দুরে বৈরাগির ভিটা অবস্থিত।

এইখানে খনন করে দুটি পাল আমলের মন্দির আবিস্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে একটি উত্তর-পূর্ব দিকে ও অপরটি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এখানে খনন করে পোড়া মাটির পাত্র, মাটির বল কস্টিপাথরের মুরতি পাওয়া গিয়েছে। গোকুলমেধ নামের একটি প্রত্নস্থল মহাস্থান গড় থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল গ্রামে অবস্থিত। এটিকে অনেকে বেহুলার বাসর ঘর বলে থাকে৷ এর সামনে সুন্দর একটা ফুলের বাগান রয়েছে। বগুরা শহর এর শিবগঞ্জ উপজেলায় ভাসু বিহার নামে একটি স্থান রয়েছে। এটি প্রাচীনকালে বৌদ্ধদের বিদ্যপাঠ ছিল।

মহাস্থানগড় থেকে অনেক প্রত্নসম্পদ আবিস্কার হয়েছে। এখান থেকে প্রাচীন মুদ্রা,  ছিলমোহর, পোড়ামাটির ফলক মুল্যবান পাথরের গুটিকা, অলংকৃত ইট ইত্যাদি। ভাসু বিহার থেকে ১ কিলোমিটার দূরে বিহার ধাপ নামে আরও একটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে।এটি শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয় ভাবে এটি তোতারাম পন্ডিতের ধাপ বা  তোতারাম পন্ডিতের বাড়ি নামে পরিচিত। এতে খনন কাজ চালিয়ে পুর্ব দিকে একটি বৌদ্ধ বিহার ও পশ্চিম দিকে একটি মন্দির পাশাপাশি আবিস্কার হয়েছিল। এছারা এখানে একটি জাদুঘর রয়েছে। জাদুঘর এর প্রবেশ করার পর এখানে প্রথমেই দেখামেলে সুদর্শন নানা ধরনের ফুলের বাগান। জাদুঘর এর ভিতর প্রাচীন কালের নানা ধরনের কালো পাথরের মূরতি, মাটির থালাবাসন, প্রাচীন মুদ্রা ইত্যাদি ইত্যাদি।

মহাস্থান গড়ের পরিবেশ

মহাস্থান গড়ের পরিবেশ খুবই মনমুগ্ধকর। নিরিবিলি পরিবেশ এ খুব সহজেই এর সুন্দর্য উপভোগ করা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভাল বলে যাতায়াত এ কোন সমস্যা হয় না। এখানে পিকনিক এর জন্য সুব্যস্থা আছে। জাদুঘর এর সামনে ছায়াঘেরা পরিবেশে সুন্দর বিস্রাম এর ব্যাবস্থা আসে৷ তাই এখানে বেরাতে আসা মানুষ ভাল ভাবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে। সুন্দর কিছু সময় অনায়েসে মহাস্থানগড়ে এসে কাটাতে পারবেন এবং এর পরিবেশ অনেকখানি উপভোগ করতে পারবেন।

বিশেষ করে শহরে দালান কোটা থেকে বেড়িয়ে এসে মহাস্থানগড় প্রাকৃতিক নীলা খেলা অনেক ভালো উপভোগ করা সম্ভব।

মহাস্থান গড় যাতায়াতের খরচ

রংপুর থেকে মহাস্থানগড়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হল বাসে করে যাওয়া। রংপুর বাস টারমিনাল থেকে বগুড়া অথবা রাজশাহী এর বাসে করে মহাস্থানগড় যাওয়া যায়।  এক্ষেত্রে রংপুর থেকে মহাস্থানবাজার পর্যন্ত যেতে জন প্রতি ১০০ টাকা লাগে। মহাস্থানবাজার থেকে সিএন জি তে করে মহাস্থানগড় জেতে হয়।এক্ষেত্রে জন প্রতি ১০ টাকা করে সিএনজি ভাড়া লাগে।আবার মহাস্থানগড় থেকে গোকুলমেধ বা বেহুলা এর বাসর ঘর যেতে ১০ টাকা খরছ হয়। মহাস্থানগড় জাদুঘর এর প্রবেশ মুল্য ২০  টাকা। গোকুলমেধ এ প্রবেশ এর ক্ষেত্রে ও ২০টাকা মুল্যের টিকেট প্রয়োজন হয়। বাকি দর্শনীয় স্থান গুলো উন্মুক্ত।

মহাস্থান গড়ে সময় কেমন কাটল

মহাস্থানগড় ভ্রমণের জন্য আমি অনেক দিন থেকেই পরিকল্পনা করসিলাম। আমাদের স্কুলের শিক্ষাসফর এ আমার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়৷ আমরা সকাল ৮ টার সময় রওনা দেই মহাস্থানগড় এর উদ্দেশ্য। ১০.৩০ টার সময় আমরা সেখানে পৌছাই। প্রথমেই আমারা মহাস্থান জাদুঘর এ যাই। সেখানকার প্রাচীন জিনিসপত্র দেখে আমি বিমহিত হয়ে গিয়েছিলাম। জাদুঘর এর মধ্যে রাখা জিনিস গুলো থেকে প্রাচীন কালের জীবনযাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছিলাম।

জাদুঘরের জিনিসপত্রের ছবি তুলা নিষেধ ছিলো। জাদুঘর এর সামনের বাগানটি অনেক সুন্দর ও সুসজ্জিত ছিল। ছবি তোলার জন্য এখানে অনেক সুন্দর জায়গা রয়েছে। জাদুঘরের পাসেই বিস্রাম এর জন্য কিছু ছোট রেস্তোরাঁ রয়েছে সেখানে আমরা সকাল এর নাস্তা করেছিলাম। জাদুঘর থেকে ফেরার পথে আমরা হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার (রঃ) এর মাজার এ প্রবেশ করি। সেখানে অনেকেই মাজার জিয়ারত করছিল। সেখানে অবস্থিত জিয়ৎ কূপ দেখেছিলাম। কিন্তু, এখন এর কুয়া পানি শুন্য। মাজার এর পাসে একটি বাজার রয়েছে। এখানে নানা ধরনের প্রসাধন সামগ্রী ও খাবার এর দোকান ছিল। খাবারের দোকানে এখানকার ঐতিহ্যবাহী দই ও কটকটি বিক্রি করা হয়।আমরা এখান থেকে কিছু খাবার কিনে ছিলাম। তারপর আমরা গোকুল মেধ এ গেছিলাম।

যাওয়ার পথে অনেক মাটির বাড়ি দেখা যায়। গোকুল মেধ এ পোরামাটির ইট এর তৈরি সুউচ্চ গড় ও এর মধ্যের কক্ষ বিন্যাস দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। প্রাচীন স্থাপত্য যে এতটা সুন্দর ও আকর্ষণীয় হতে পারে তা এখানে না আসলে বোঝা জায় না। গোকুল মেধ এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা অপরুপ সুন্দর করতোয়া নদী এর সুন্দর্য্য কে আরও বহু গুনে বারিয়ে তোলে। গোকুল মেধ এর গেট এর সামনে অনেক গুলো পানের দোকান আসে। সেখানে নানা নামের বাহারী পান বিক্রি করা হয়৷ যেমনঃ শাহী পান, বেহুলা লক্খীনদর পান সহ নানা নামের পান ছিল সেসব দোকানে। যা আমরা অন্য কোথাও দেখিনি। সবমলিয়ে দিনটি অনেক সুন্দর কেটেছিল।

মহাস্থানগড় আমাদের সমৃদ্ধ প্রাচীন ইতিহাস এর এক অপরুপ নিদর্শন হিসেবে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি লাভ করেছে। যা আমাদের ঐতিহ্য কে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের সকলের উচিত ইতিহাস জানার উদ্দেশ্যে মহাস্থানগড় দেখতে যাওয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here