মুখে ব্রণ হওয়ার কারণ ও ব্রণের সমস্যা দূর করার প্রয়োজনীয় উপায়

0
274
বর্তমানে প্রত্যেক ছেলে মেয়ের সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে মুখে ব্রণ হওয়া একটি।সৌন্দর্য সচেতন যেকোনো মানুষ সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক ব্রণ তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো আর তাই সবসময় এই সমস্যা থেকে সবাই দূরে থাকতে চায়। খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন, ব্রণ হওয়ার কারণ এবং এর থেকে মুক্তির উপায় কী? তাই আজকে আমরা ব্রণ কেন হয় এবং এর থেকে মুক্তির উপায় গুলো নিয়ে আলোচনা করব। ব্রণ কেন হয় এবং এর থেকে মুক্তির উপায় গুলো জানার আগে জানতে হবে, ব্রণ কী?ব্রণ কোথায় হয়?ব্রণের প্রকারভেদ সম্পর্কে।
ব্রণ কীঃব্রণ হলো মূলত সেবাম নামক তৈলাক্ত পদার্থ জমে যাওয়ার ফল।ত্বকের সেবাসিয়াস গ্রন্থি থেকে সেবাম নামক একধরনের তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসৃত হয়।এই সেবাম আমাদের ত্বককে নরম রাখে অর্থাৎ প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজারের কাজ করে।কিন্তু কোন কারণে সেবাসিয়াস গ্রন্থির মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তার সেবাম নিঃসরণ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং তা জমে ফুলে ওঠে, যা ব্রণ নামে পরিচিত।
ব্রণ কোথায় হয়ঃ
ব্রণ হওয়ার কোন নির্ধারিত স্থান নেই।ব্রণ কপালে,গালে, চিবুকে বা মুখের যেকোন জায়গায় হতে পারে। এমনকি পিঠে ও ঊরুতে মাঝে মাঝে ব্রণ হতে দেখা যায়।

 ব্রণের প্রকারভেদঃ

সাধারণত পাঁচ ধরণের ব্রণ হতে দেখা যায়।
১. ট্রপিক্যাল একনি(যা অতিরিক্ত গরমে এবং আর্দ্রতায় পিঠে ও ঊরুতে বেশী হয়)
২. প্রিমেন্সট্রুয়াল একনি(যা নারীদের মাসিকের সপ্তাহখানেক আগে হয়)
৩. একনি কসমেটিকার(যা বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করার ফলে হয়)
৪. একনি ডিটারজেনিক(যা বারবার মুখে সাবান ব্যবহার করার ফলে হয়)
৫. স্টেরয়েড একনি(যা স্টেরয়েড ঔষধ সেবন বা ব্যবহার করার ফলে হয়)
 ব্রণ কেন হয়ঃ ব্রণ কেন হয় তার কোন একটি সুনির্দিষ্ট কারণ নেই।বিভিন্ন কারণে ব্রণ হয়।নিচে কারণগুলো তুলে ধরা হলোঃ
ত্বকের অযত্ন করাঃ মুখের ত্বক নিয়মিত পরিষ্কার না করা ব্রনের অন্যতম কারণ। দূষণ, ময়লা,মেকআপ এবং অন্যান্য টক্সিন নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সহজেই ত্বকের ছিদ্রে আটকে যায়। তাই প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এবং ঘুমতে যাওয়ার আগে ফেশওয়াশ বা স্ক্রাবার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিতে হবে ।
হরমোনের পরিবর্তনঃ অনেক সময় হরমোন ক্ষরণের তারতম্য হয়। আর এর ফলে ব্রণ দেখা দেয়।হরমোনের কম বেশি ক্ষরণ রক্তের পাশাপাশি দাগ ও ফেলে ত্বকে।
টুথপেষ্টের কারণেঃ কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন যে, কোন কোন টুথপেষ্ট ব্যবহার করার ফলে মুখে ব্রণের সৃষ্টি হয় । কারণ টুথপেষ্ট ত্বকে শুষ্ক করে তুলে এবং টুথপেষ্টের সাথে মুখের ব্যাকটেরিয়া একত্রিত হয়ে ঠোঁটের আশেপাশে ব্রণের সৃষ্টি করে। এছাড়া টুথপেষ্টে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান যেমন- অ্যালকোহল,ফ্লোরাইড, এসেনশিয়াল অয়েল,হাইড্রোজেন পারক্সাইড এবং মেন্থল যা ত্বকের জন্য মোটেও উপকারী নয়। তাই এসবের সংস্পর্শে ব্রণ দেখা দিতে পারে।
শ্যাম্পু ও কন্ডিশনারের ব্যবহারের ফলেঃ শ্যাম্পুর মধ্যে যে উপাদানটি চুলে ফেনা তৈরি করে তা ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বৃদ্ধি করে। আর কন্ডিশনারের তৈলাক্ত পদার্থ মুখের লোমকূপ বন্ধ করে দেয় যার ফলে ব্রণ হয়।
ব্যবহৃত জিনিস থেকে ব্রণ সৃষ্টিঃ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস থেকে মুখে ব্রণের সৃষ্টি হয়। যেমন আমরা যখন ঘুমাই আমাদের মাথা এবং মুখের তেল,জীবাণু বালিশের কভারে লেগে যায়। ক্রমাগত এগুলো জমা হয়ে আমাদের ত্বকে লাগে আর তার থেকে ধীরে ধীরে ত্বকে ব্রণ হয়। এছাড়া তোয়ালে,মেকআপ ব্রাশ,স্পঞ্জ, পাফ নিয়মিত পরিষ্কার না করে ব্যবহার করলে ত্বকে ব্রণ হতে পারে।
কম ঘুমঃ অনেক সময় পরিমিত ঘুম না হলে ব্রণ হয়।তাই নিয়মিত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। এর ফলে ত্বকে হরমোনের ব্যালেন্স ঠিক থাকবে,রক্ত সঞ্চালন ভালো হবে এবং ত্বক থাকবে আয়নার মতো ঝকঝকে ।
টেনশনে ফলেঃ অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বক,ক্লান্তি, টেনশন ইত্যাদি সব মিলিয়ে মুখে ব্রণের সৃষ্টি হয়।
অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়াঃ অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড যেমন- চিপস,চকলেট, আইসক্রিম, পিজ্জা,বার্গার,সিঙ্গাড়া, মিষ্টি, ক্যাডবেরি,তেলে ভাজা,কোল্ড ড্রিংকস ইত্যাদি খেলে মুখে ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়।
অতিরিক্ত ঘাম থেকেঃ অতিরিক্ত ঘাম থেকে ও অনেক সময় ব্রণ দেখা দেয়। কারণ বেশি ঘাম মানেই জীবাণু, ময়লা,দূষণ ত্বকে জমে ত্বকের ছিদ্র বন্ধ হওয়া। যার ফলে ত্বকে নানান সমস্যা দেখা দেয়।
সঠিক মেকআপ প্রোডাক্ট ব্যবহার না করাঃ ত্বকের প্রকৃতি অনুযায়ী মেকআপ ব্যবহার না করলে বা সালফেট, প্যারাবেন্স সমৃদ্ধ মেকআপ ব্যবহার করলে মুখে ব্রণ হয়। উপরোক্ত কারণ গুলো ছাড়া আরও বিভিন্ন কারণে ব্রণ দেখা দিতে পারে। আমরা জানালাম কেন ব্রণ হয়,এবার জানব ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় গুলো।

কীভাবে ব্রণ থেকে মুক্তি পাবঃ

১. যেসব কারণে ব্রণ হয় তার থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমন- টুথপেষ্ট,শ্যাম্পু,কন্ডিশনার ব্যবহারের পর মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ব্যবহৃত তোয়ালে,মেকআপ ব্রাশ,স্পঞ্জ, পাফ,বালিশ ও বিছানার চাদর নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
২. দিনে দুই থেকে তিনবার সাবান বা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুতে হবে।বাইরে থেকে এসে সাথে সাথে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া হালকা গরম পানির স্টিম নেওয়া যেতে পারে।
৩. বাজেরে বিভিন্ন তেল ছাড়া ওয়াটার বেসড মেকআপ পাওয়া যায়। এই ওয়াটার বেসড মেকআপ ব্যবহার করতে হবে।
৪. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, আলাদা তোয়ালে ব্যবহার করতে হবে এবং মাথাকে খুশকি মুক্ত রাখতে হবে।
৫. রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে ফল, সবজি খেতে হবে ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে হবে এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।
উপরোক্ত উপায় গুলো নিয়মিত পালন করার পরেও যদি ব্রণের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে ব্রণের সমস্যা প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাই এখন জানব ব্রণ হলে কি করা যাবে না ও কি করে ব্রণের সমস্যার প্রতিকার করা যায়।
ব্রণ হলে যা করব নাঃ
১. যাদের ত্বকে ব্রণের সমস্যা আছে তাদের কে অবশ্যই রোদকে এড়িয়ে চলতে হবে।
২. তেলযুক্ত ক্রিম বা ফাউন্ডেশন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. ব্রণে হাত লাগানো যাবে না ও খুঁটানো যাবে না। কারণ এতে মুখে কালো দাগের সৃষ্টি হয়।
৪. যাদের ত্বকে ব্রণ দেখা দিয়েছে তাদের কে অবশ্যই দুধ ব্যবহার করে রূপচর্চা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. ব্রণ দেখা দিলে অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ব্রণ হলে কী করনীয়ঃ
অনেক সচেতনতা ও যত্নের পরে ও যদি ব্রণ হয় তাহলে আমরা যা করতে পারি তা নিম্নে দেওয়া হল-
১. নিমপাতা ও কাঁচা হলুদের পেষ্ট বানিয়ে মুখে ব্যবহার করা যেতে পারে।এই পদ্ধতি কয়েক দিন অবলম্বন করলে ব্রণ চলে যাবে।
২. যদি কারো মুখে ব্রণ থাকে তাহলে সে পুদিনাপাতার পেষ্ট ২০ থেকে ২৫ মিনিট ব্রণের উপর লাগিয়ে রাখতে পারে।তারপর সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবে। এতেও ভালো কাজ হবে।
৩. এক টেবিল চামচমধু,এক টেবিল চামচ লেবুর রস ও এক টেবিল চামচ আমন্ড ওয়েল ভালোভাবে মিশিয়ে পেষ্ট বানিয়ে ব্রণের উপর লাগানো যেতে পারে। প্যাকটা ভালো করে শুকিয়ে গেলে বেশি করে সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
৪. সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিষ্কার পানিতে তুলসি পাতা ছেঁচে দিয়ে তা গরম করে ঐ পানির ভাপ মুখে নিলে অনেক উপকার হয়।
এখানে যেসকল উপায়ের কথা বলা হয়েছে সেগুলো খুবই কার্যকর ও পরীক্ষিত। এছাড়া এতে কোন রাসায়নিক উপাদান ও নেই যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।তাই নিয়মিত এই পদ্ধতি গুলো মেনে চললে অবশ্যই ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং একটি সুন্দর, স্বাস্থ্য সম্মত ও উজ্জ্বল ত্বক পাওয়া যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here